গল্প -পবলু লেখক -চিত্তরঞ্জন গিরি

গল্প -পবলু লেখক -চিত্তরঞ্জন গিরি

শনিবার ছোটদের রুপকথার গল্প

বিভাগ -ছোটদের ছোটগল্প
গল্প -পবলু
লেখক -চিত্তরঞ্জন গিরি

গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরম। জৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকের
কোথাও কোথাও গ্রামের মাঠে মাঠে ফাটল ধরেছে
-বৃষ্টি না হওয়ার জন্য । মেঠোপথের সোঁদামাটির গন্ধ ,আর মাঝে মাঝে দক্ষিণের বাতাস-বয়ে নিয়ে আসে-পাকা আম কাঁঠালের সুবাস । গরমের অসস্তি তার উপর চাষীরা অনাবৃষ্টির জন্য -মাঠে মাঠে লাঙল নামাতে পারছেনা । বলতে গেলে এই রাধানাথপুর গ্রামে প্রত্যেকের বাড়িতে চাষ হয় ।
আর এখনকার প্রধান জীবিকা চাষ আবাদ-তাই মানুষের চাতক পাখির মত -আকাশে তাকিয়ে থাকা স্বাভাবিক ।
কিন্তু পবলুর মনে আনন্দটা বেশি করে দেখা যাচ্ছে ,আনন্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক । এখন মাঠে লাঙল টানতে হচ্ছে না ,মার খেতে হচ্ছে না -প্রচন্ড রোদ্দুরের তাপ সহ্য করতে হচ্ছে না ,শুধু খাচ্ছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও নদীর তীরে কোথাও
তীরে কোথাও গাছের নিচে , কোথাওবা ফাঁকা মাঠে -সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে গল্প আর আড্ডা মারা -এর চেয়ে সুখের কাজ কি হতে পারে ! বড্ড আলসে স্বভাবের -আর ধূর্তামি আর চালাকিতে জুড়ি মেলা ভার ! দেখতে বেশ সুন্দর -খাওয়া দাওয়া কম পায়না ,খড় কূটো ঘাস গাছের পাতা খইল কুঁড়ো -একটা গরুর জন্য যা দরকার সব পায় তাই শরীর তৈরি হয়েছে বেশ সুন্দর আরো বেশি সুন্দর তার মাথায় দুটো শিং, উপরের দিকে বেশ সুঁচালো !
কিছুদিনের মধ্যে বৃষ্টি নামল। সবার ঘরে ঘরে বীজধান ফেলার জন্য-মাঠে লাঙ্ল নামার তোড়ঝোড় পড়ে গেল ! তা থেকে আমাদের ব্যতিক্রম ঘটল না । সুতরাং সুখের পালঙ্ক থেকে নেমে অন্যান্নদের সাথে পবলুর বেরোতে হল লাঙল করতে -দুদিনের পর আবার বেশ কিছুদিনের জন্য পবলুদের বিশ্রাম ।
বাড়িতে থাকলে দিনের কোন না কোন সময়ে পব লুর সাথে দেখা করি, শরীরের কোথাও কোথাও হাত বুলিয়ে দিই -আদর করা যাকে বলে ।
লাঙ্ল শেষ হওয়ার পরের দিন তার কাছে যেতে আগের মত মুখ বাড়িয়ে এলনা -তার দুঃখের কারণটা খুঁজতে গিয়েদেখলাম -শরীরের পিঠের দিকটা ছড়ির আঘাতে কাটা দাগ , আর আমার বুঝতে দেরি হলনা -মার খাওয়াটাই ওর অভিমান ও দুঃখের কারণ ।
–নিশ্চয়ই তোকে এমনি এমনি মারেনি ! কিছু একটা দোষ করেছিলি -কি দোষ করেছিলি -বল ?
নরম সুরে গলায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম ।
তখন পবলু উত্তর করে “দুপুর হয়েগেছিল আমার খিদেও পেয়ে ছিল -”
–তাই তুই পালিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলি ?
-হ্যাঁ। বলে কেঁদেফেলে পবলু
-ঠিক আছে, কাঁদিস না, যে লাঙ্ল করেছিল তাকে বেশ করে বকে দেব -তুই কাঁদিস না ।
পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে সান্তনা দিলাম ।
তবুও পবলু ভাল করেই জানে -যতবারই আমি পবলুকে মারতে না বলি কেবল বলাই হয় শুধু মারখাওয়াটা কম হয় না !
আমার আদর করা -শেষ করে ,চলে আসার পর
পবলু মনে মনে ভাবল-এখানে থাকার অর্থ-শাস্তি
পাওয়া। আর এই শাস্তিটা কিছু দিনের পর পাওয়া আরম্ভ হবে ।
দু-এক দিনের পর মাঠ শুকনো হতেই অন্যান্য গরুদের সাথে পবলুকেও মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসা হল-ঘাস খাওয়ার জন্য ।কয়েক দিন আবদ্ধ থেকে
ফাঁকা মাঠে ছাড়া পাওয়া-তাদের কাছে খুব আনন্দের , তাই গরুরা নিজেদের মধ্যে খেলাধুলা,গল্প হুল্লোড়ে মেতেগেল । কিন্তু এদের মধ্যে পবলুকে চুপচাপ মনেহল
পবলু ছাড়া পেয়ে ভাবতে থাকেযদি এখান থেকে পালায় তবে শাস্তির হাত থেকেই রেহাই পাওয়া যাবে । আর এই কাজটা এখনই করতে হবেই ।
যেই ভাবা সেই কাজ । দৌড় -দৌড়- দৌড় !
পরিচিত পুকুর গাছপালা ,নদীর ব্রীজকে পেছনে ফেলে -বড় রাস্তায় না গিয়ে ঘন সারি ঝাউ বাবলা বট অশ্বত্থের মধ্যে আঁকাবাকাঁ পথ দিয়ে দৌড় আর দৌড় । দৌড়তে দৌড়তে এমন এক জায়গায় এল সেখানে কোন মানুষের বাসস্থান চোখে পড়ে না ! শুধু ঘন সারি গাছ, মধে নদী, নালা ও ডোবা।
যেতে যেতে এক গভীর জঞ্জলে প্রবেশ করল, কিছুদুর যেতে কতকগুলি গাছ আর লতা পাতা দিয়ে একটা ঝোপ দেখতে পেল। ঝোপটা পেরোতেই পবলু একটা সিংহকে চোখে পড়ে। তার বুঝতে অসুবিধা হলনা এই জঙ্গলে সিংহ বসবাস করে। তাই পবলু পিছনে ফিরে পালিয়ে আসার চেষ্টা করল। পবলুর এই পালিয়ে আসার চেষ্টা দুরে কয়েকটা সিংহের চোখে পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে – “আমাদের সামনে গরু এসেও পালিয়ে যাবে! চল আমরা বরিগে”।
যেই বলা তেমনি নিজেরা ধাওয়া করতে লাগল গরুটির পিছনে।
পবলু তখন নিজে মনে মনে বলতে লাগল এই সিংহদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় পাল্লা দেওয়া অসম্ভব, খানিক দৌড়ে দেখতে পেল সেই ফেলে আসা ঝোপ, তখন আর অন্য দিকে না তাকিয়ে পবলু ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল।এদিকে পেছন ধাওয়া করতে আসা সিংহরা ঝোপের কাছে আসতেই আর গরুটিকে দেখতে না পেয়ে একটি সিংহ বলতে লাগল ‘গরুটিকে যদি ধরা যেত , তাহলে রাজার কাছে নিয়ে গিয়ে আমরা বড় বকশিশ পেতে পারতাম’
অন্য সিংহটি বলল ,’তা তো পেতাম ,কিন্তু গরুটা কোথায় গেল ?
প্রথম সিংহটি বলে ‘চল আরও কিছুক্ষণ খুঁজি’।
এই বলে তারা এদিকওদিক খুঁজতে লাগল।
এদিকে পবলু ঝোপের ভেতর ঢোকার পর কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।একটু খানের পর সিংহদের কথা শুনতে পেল।তার পর কিছুক্ষণ নিজেকে নরা চরা
না করে চুপ থাকতে গিয়ে দেখতে পেল ঝোপের ভেতর একটু দুরে একটা মরা সিংহ পরে আছে।কিছুক্ষণপর তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল,তারপর আস্তে আস্তে মরা সিংহ এর কাছে এগিয়ে গিয়ে সিংহের কাছে এগিয়ে গিয়ে সিংহের চামড়া বার করতে আরম্ভ করল।কিচ্ছুক্ষনপর সমস্ত চামড়া পবলু বার করে ফেলল।তারপর নিজে সেই চামড়া পরে পড়ল। তারপর ভাবল এবার যদি ঝোপ থেকে বেরই সিংহরা নিশ্চয়ই তাড়া করবে না।যতই মনকে স্বান্তনা দিক না কেন মনের ভিতরের ভয়টা পবলুর যায়নি,ঝোপের বাইরে বেরোতেই সামনে তিনটে সিংহ।তাদের দেখে পবলু মনে মনে ভাবতে লাগল এবার বুঝি তার প্রাণটা যাবে,কিন্তু মনের সাহস হারাল না।এদিকে সিংহরা গরুকে খুজঁতে গিয়ে এক বিচিত্র প্রাণীকে দেখতে পেল।এইরকম প্রাণী কখন দেখে নি।শরীরের গঠনটা তাদেরই মতন সব কিছু।মাথায় দুটো শিং।তাই ভয়ে তারা পিছনে হাটার চেষ্টা করে।কিন্তু চালাক পবলুর বুঝতে অসুবিধা হল না যে তাকে দেখেই ভয়ে পালানোর চেষ্টা করছে ওই সিংহরা।পবলু তখন সাহস করে গম্ভীর হয়ে বলল,”পালাচ্ছিস কোথায় তোরা?আমার কাছ থেকে তোদের নিস্তার নেই।” নতুন আগন্তুকএর কথা শুনেই সিংহরা হকচকিয়ে গেল।পবলু বলে” তোদের রাজা কোথায় তাড়াতাড়ি ডেকে আন।নাহলে সবাইকে শেষ করে দেব।”পবলুর চিৎকারে সিংরা প্রচন্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে,অতি সহজেই সন্মতি জানায় পবলুর কথায় ,তারপর সিংহরা গুটি গুটি পায়ে তাদের রাজাকে ডেকে আনতে যায়।
সিংহরা চলে যাওয়ার পর,পবলু ঐখানে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল।তারপর লম্বা একটা গাছের নীচে বসল।তারপর ভাবতে লাগল,’যদি ওরা সংখ্যায় অনেকে আছে,আর এসেই যদি তাকে মারার চেষ্টা করে,তাহলে মরতে বেশী সময় লাগবে না,মনের ভেতর রাজা হওয়ার স্বাদ ঘুচে যাবে।এইরকম কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে পবলু একটা সিদ্ধান্তে আসল,’যদি অনুমানটা ঠিক হয়ে সুছে স্বচ্ছন্দে রাজার মত বাকি জীবনটা কাটানো যাবে’। এই ভেবেই পবলু সিংদের আসার অপেক্ষা করতে লাগল।
এদিকে সিংহরা ছুটতে ছুটতে তাদের রাজার দরবারে হাজির হল। রাজাকে নতুন আগন্তুকের শরীরের বর্ণনা শুনে অবাক তো হলেই তার উপর ভয় লাগল। অন্যান্য সিংহরা নতুন অগন্তুকের সম্বন্ধে কথা শুনে ভয়ে এগোতে সাহস করল না।এমনকি রাজাও যেতে অসম্মতি প্রকাশ করল,তখন যারা খবর নিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে,’রাজা আপনি যদি না যান,তাহলে আমাদের সবাইকে মরতে হবে,কেন?’
তখন সিংহটি বলে,’ও বলেছে তোদের রাজা যদি না আসে কাউকে বাঁচতে দেব না’।
এই কথা শুনে রাজা কিছুক্ষণ ভাবল,তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে ,’এমনিতেই মরতে হবে যখন গিয়ে না হয় বাঁচার আশা করি’।
সবাই রাজি হয়ে গুটি গুটি পায়ে ভয়ে ভয়ে এগোতে আরম্ভ করল।
কিছুক্ষন পর নতুন আগন্তুকের সামনে ভয়ে ভয়ে সিংহরা হাজির হয়। তখন পবলু তাদের দেখে গম্ভীর গলায় বলে, “তোদের রাজা কে?”
সিংহদের রাজা শান্তস্বরে বলে, ” আমি “।
পবলু বলে, ” আজ থেকে তোরা যদি আমার কথা না শুনিস,তোদের আমি বন ছাড়া করব।”
সিংহরা বলে, ” কি করতে হবে?”
পবলু বলে, ” আমি যদি তোদের রাজা হই, তোরা কি কেউ অসম্মতি প্রকাশ করবি!”
সিংহরা বলে, ” না! আমাদের বাঁচিয়ে রাখছেন, এটাই আমাদের সৌভাগ্য।”
এরপর থেকে পবলু ঐ বনে মনের সুখে সিংহদের নিয়ে রাজত্ব করতে আরম্ভ করল। আগের মত লাঙল করার সময় মার খাওয়ার যন্ত্রনা নেই, তার পরিবর্তে রাজসুখের আনন্দভোগ!

আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যে নদীটা গেছে, সেই নদীতে প্রত্যেক দিন বিকালে নৌকা চড়া আমার অভ্যাস, এতে আমি আনন্দ পাই। এদিকে পবলু চলে যাওয়ায় বাড়িতে তাকে নিয়ে কত খোঁজাখুঁজি! আমি তাকে ভালোবাসতাম তাই তার চলে যাওয়াতে কয়েকদিন দুঃখ পেয়েছিলাম।”

ঠিক কয়েক মাস পর এক বিকালে আমি নৌকা চালাচ্ছিলাম, হঠাৎই প্রচণ্ড ঝড় আসে। নৌকাকে পাড়ে ভেড়ানোর মত সময় পাইনি!

দুদিন পর দেখি গভীর জঙ্গলের পাশে আমার নৌকা ঠেকেছে। আমি নৌকায় শুয়ে আছি। আমি নৌকা থেকে নেমে ঐ জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালাম। আমার বুঝতে দেরি হলনা যে, আমি ঝড়ে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম।
যাইহোক, অচেনা জায়গা, রাস্তাঘাট কিছুই জানিনা, পেটে ক্ষিদে। এই অবস্থায় বনের ভিতরে ঢুকতে লাগলাম, যদি কোনো লোকজন লেখতে পাই। কিন্তু হঠাৎ দেখতে পেলাম এক দল সিংহ! সবাই আমাকে দেখতেও পেয়েছে।
আমি ভাবলাম আমার প্রাণটা বুঝি গেল!
তাদের মধ্যে সবাই না এসে একটা সিংহ এগিয়ে এল, আমি তখন দৌড়তে চেষ্টা করলাম। এদিকে শরীরে শক্তি নেই, তার ওপর সিংহ! হঠাৎ সামনে হোঁচট খেয়ে পড়লাম, ভাবলাম আর কয়েক সেকেন্ড আমার আয়ু! তাই আকাশ আর গাছপালার দিকে তাকিয়ে নিলাম। সিংহটা কাছে এসে বলছে,” তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন ভয় পাওয়ার কিছুই নেই।”
মনে মনে ভাবি, এ জগতে আছি তো, না স্বপ্ন দেখছি! যার আমাকে খাওয়ার কথা, সে আমাকে সান্তনা দিচ্ছে!
তারপর ফিসফিসয়ে সিংহটি বলে, ” আমি তোমাদের পবলু!”
– ” তুই এখানে কি করে এলি? আর তুই তাহলে সিংহ নয়!”
তখন পাবলু তার ঘটনাটা বলল প্রথম থেকে রাজত্ব করা পর্যন্ত।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,” তুই আমায় বাঁচালি! তুই আর একটা উপকার করে দে তো..”
– ” কি?”
– ” আমি বাড়ির রাস্তা ভুলে গেছি, আমাকে পৌঁছে দিয়ে আয়।”
সে বলে, ” একটা শর্তে। যদি তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে বেঁধে না রাখ!”
হেসে উত্তর দিলাম, ” রাজি।”

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply




© All rights reserved © 2019 TaanZeem.com
Developed by ITRakin.com